#অপেক্ষা
#উম্মে_সালমা_নিশু
- দাদা আমার আব্বুর মা কে?
- তোমার দাদু তোমার আব্বুর মা।
- তাহলে আমার মা কে?
বুড়ো দাদু বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন কি উত্তর দিবেন নাতিকে। ঠিক সেইসময় পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম আমি। বুকটা ধুমড়ে মুচড়ে উঠেছিল ছোট্ট বাচ্চাটির কথা শুনে। দ্রুত রুমে গিয়ে বললাম, জানো তোমার বাবার কপাল খুব খারাপ।
সায়েদ বলল, কেন আনটি?
- তোমার বাবার মাত্র একটা মা আছে, আর সেটা হলো তোমার দাদু। আর তোমার কপাল তো অনেক ভালো তোমার ৩ টা মা আছে। তোমার আম্মা, তোমার ছোট আম্মু আর আমি। বাব্বাহ আমাদের সায়েদের তিন তিনটা মা আছে। আহারে! আমারও মাত্র একটা মা আছে।
আমার কথা শুনে সায়েদের চোখে খুশির ঝিলিক দেখতে পেয়েছি আমি। কিন্তু তখন আমার ভেতরে চলছিল এক মহাপ্রলয়। কষ্টে দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছিলো আমার ভেতর। তারপর সায়েদ কে বুকে টেনে চলে গেলাম বাইরের চাঁদের আলোয়।
- সায়েদ তোমাকে যদি কেউ বলে কে তোমার মা? তুমি বলবে আমিই তোমার মা। ঠিক আছে।
সায়েদ আচ্ছা বলে মাথা দোলালো।
আমি আবার বললাম, আব্বু তোমার যদি কিছু লাগে কিছু খেতে ইচ্ছা করে তুমি আন্টিকে বলবে। কেমন?
সায়েদ পুনরায় আচ্ছা বলে মাথা দোলালো।
আমি সায়েদের কপালে, গালে চুমু খেয়ে ওকে বুকে নিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম। তারপর আবার ওর দাদুর রুমে নিয়ে গিয়ে বললাম, আন্টির সাথে থাকবে আজকে?
সায়েদ বলল, না আমি দাদার কাছেই থাকবো। আমি আচ্ছা বলে মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে ওর দাদার কাছে ঘুমাতে দিয়ে এলাম। রুমে এসেও খুব খারাপ লাগছিল সায়েদের জন্য। মা হারা একটা বাচ্চার যন্ত্রণা সেই মুহূর্তে আমি খুব করে ফিল করছিলাম। আর ভাবছিলাম, আচ্ছা ওর মা কি এখন ওর কথা ভাবে? নাকি নতুন স্বামী আর সংসার নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে সে? তার কি একটা বার মনে হয়না আমার বাচ্চাটা মা ডাকবে কাকে?
,
হুম সায়েদ আমার সতীনের ছেলে। ও আমায় আন্টি বলে ডাকলে আমি ওকে সন্তানের মতো ভালোবাসি। আল্লাহর কাছে সব সময় এটাই প্রার্থনা করি কখনো কোনভাবে ওর জন্য যেন আমার মনে কোন হিংসা, বিদ্বেষ সৃষ্টি না হয়। সায়েদের বাবা একজন প্রবাসী। বিয়ের কয়েকমাস পরেই জীবিকার তাগিদে তাকে পাড়ি জমাতে হয় প্রবাসে। জানিনা কোন মোহে সায়েদের মা জড়িয়ে পড়ে পরকিয়াতে। সন্তানের কথা অবধি তখন সে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে। মামলা করে ডিভোর্সের জন্য। তাকে ফিরিয়ে আনার ব্যার্থ চেষ্টা করে সায়েদের বাবা ও তার পুরো পরিবার। কিন্তু তখন তার চোখে নতুন স্বপ্ন। সন্তানের কথা ভাবার তার সময় কই! কাবিনের ৪ লক্ষ টাকা আদায় করাই ছিল তার মূখ্য উদ্দেশ্য। কোর্টে বসেই নাকি নিজ হাতে টাকা গুণে নিয়েছিল সায়েদের মা। সেই টাকায় নতুন সংসার সাজানোর স্বপ্নে এতটাই বিভোর ছিল যে নিজের সন্তানের কান্না আর আহাজারি ও কোন দাগ কাটেনি তার হৃদয়ে। আচ্ছা একটা মা কি করে এত নিষ্ঠুর হতে পারে? সত্যি আমি এটা ভাবতেই পারছি না। সেদিন কোর্ট থেকে সায়েদ কে নিয়ে আসার পর সে যখন কান্নাকাটি করছিল তখন ওর মা কে ফোন দিয়ে ওর জেঠিমা যখন বলছিল, "সায়েদ কে কি একটু নিয়ে আসবো ও তোমার জন্য খুব কান্না করছে।" ওর মা নাকি জবাব দিয়েছিল, মা মরে গেলে বাচ্চারা কি করে থাকে? ওকে বলুন ওর মা মরে গেছে। এত নিষ্ঠুর মা ও পৃথিবীর বুকে আছে!!! এই গল্প না শুনলে কখনো বিশ্বাস করতে পারতাম না আমি। হুম সায়েদের জন্মদাত্রী মা সেদিন মরে গিয়েছিল ঠিক কিন্ত সায়েদ পেয়েছিল নতুন এক মা সে হলো তার জেঠিমা। উহু, জেঠিমা নয় সায়েদ তাকে আম্মা বলেই জানে। দু'বছর বয়সী সায়েদকে ৫ বছরের করে তুলেছেন তিনি নিজের সন্তানের মতো করেই৷ তবু সায়েদ বড় হচ্ছে তাই আস্তে আস্তে ওর মনে অনেক প্রশ্ন জেগে উঠছে। বেড়ে চলেছে ওর কৌতুহল।
,
বিয়ের আগেই আমি সায়েদের কথা জেনেছিলাম। সেদিনই নিজের মধ্যে একজন মা মা ভাব জেগে উঠেছিল। কারণ যার মা নেই সেই বুঝে মা হারানোর যন্ত্রণা কি!
যখন আমি খুব করে মা কে জড়িয়ে ধরতে চাই তখন কিছুতেই তাকে কাছে পাইনা। তখন বুকের ভিতরের সেই তীব্র হাহাকার কতটা কষ্টের তা মা হারা একজন সন্তানই বুঝতে পারে। একজন মায়ের কাছেই থাকে সন্তানের সকল আবেগ-আবদার। অথচ সায়েদ! ও তো সেই আবেগ আবদার থেকে বঞ্চিত। যদিও ওর জেঠিমা ওকে মায়ের মতই সব করে, তবু কোথায় যেন ওর মাঝে আমি জড়তা খুঁজে পাই। আমি ওর সব জড়তা কাটিয়ে তোলার কথা ভাবছিলাম।
,
সেদিন আমি ছোট্ট সায়েদের যন্ত্রণাটা খুব করে অনুভব করেছিলাম। মায়ের শূন্যতা আমাকে কতটা কষ্ট দেয় আমি ভালো করে বুঝি। তাই সে কষ্ট একটা বাচ্চাকে কতটা কষ্ট দিতে পারে একটু হলেও আন্দাজ করতে পারি। সেদিন কেমন জানি একটা টান অনুভব করছিলাম, বুকটা কেমন আনচান আনচান করছিল তার জন্য। আর ওর প্রশ্ন আজ আমায় আবার অস্থির করে তুলেছে। আমি ওকে নিজের সন্তানের মতই ভালোবাসি, ভালোবাসতে চাই। তবু মনে ভয় জাগে আমার সন্তান হলে ওর দায়িত্ব ঠিক ভাবে পালন করতে পারবো তো? কখনো সায়েদ নিজেকে আলাদা ভাববে না তো? এটা ভাববে না তো সৎ মা বলে ওকে কম ভালোবাসি!! আল্লাহকে আমি সব সময় বলি আমি যেন আমার দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করতে পারি। কখনো যেন সায়েদের জন্য আমার মনে হিংসা না জন্মায় এটাই শুধু চাই।
,
আর সায়েদের মা!!! যে স্বপ্ন দেখে সে স্বামী, সংসারের কথা না ভেবে চলে গিয়েছিল মরীচিকার মত তার সেই স্বপ্ন হারিয়ে যেতে সময় লাগেনি। যে ডিভোর্সি বড় বোনের বুদ্ধিতে সে এই কাজ করেছিল সেই বোন তাকে ফাঁকি দিয়ে সেই টাকায় নিজে বিয়ে করে নেয়। আর যার সাথে নতুন সংসারের স্বপ্ন সাজায় সেও ছুঁড়ে ফেলে তাকে। পরিবার আর সমাজের দোহাই দিয়ে ডিভোর্সি কে বিয়ে করতে অস্বীকার জানায় সে ছেলে। সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে কাজের লোক হয়েও ফিরে আসতে চায় সে সায়েদের বাবার সংসারে। কিন্তু সায়েদের বাবা আর তার পরিবার পুনরায় সুযোগ দেয় নি সেই বিশ্বাসঘাতকিনী কে। সব হারিয়ে আজ বাবার বয়সী বুড়োর সাথে সংসার করতে বাধ্য হয়েছে সায়েদের মা। আল্লাহর বিচার হয়তো এমনই। এভাবেই আল্লাহ শাস্তি দেন অপরাধি, নিষ্ঠুর, বিশ্বাসঘাতকদের।
,
সায়েদ আর তার বাবা কিন্তু আল্লাহর দয়ায় ভালোই আছে। আল্লাহ কখনো তার নেক বান্দাদের নিরাশ করেন না।আমার মনে পড়ে যায় সেই সূরা আদ দুহার ৫ নাম্বার আয়াতটি-
"শীঘ্রই তোমার রব তোমাকে এত দিবেন যে, তুমি খুশি হয়ে যাবে।"
আলহামদুলিল্লাহ আলা কুল্লি হাল।
আর আমি প্রতিটি মুহূর্তে অপেক্ষায় আছি সায়েদের মুখে মা ডাকটি শোনার জন্য। আমি জানি আমার রব আমায় নিরাশ করবেন না....

Post a Comment