খালেদা জিয়া টাইপ চশমা পড়ে হালকা আড় চোখে তাকানো মেয়েটা এই শহরে আমাকে চুমু খাওয়া শিখিয়েছিল।

চোখটা তার দিকে পড়তেই চেনা চেনা লাগলো। বেশ পরিচিত মনে হচ্ছে। কিন্তু মাথাজুড়ে চকচকে হিজাব, মুখের সানগ্লাস আর মুটে যাওয়া শরীরের কারণে তাকে চিনতে পারিনি। পাক্কা ষোল বছর পর এমনিতেই চেনা মানুষের মুখ অচেনা হয়ে যায়। তারপরও রিমিকে চিনলাম।

স্মৃতির পাতার অনেক সুপ্ত ঘটনা ছেদ করে মাথার মধ্যে দৌড়ায়। কি না করেছি এই মেয়েটার জন্য। প্রখর রোদে ফার্মগেট ওভার ব্রীজে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কখন সে আসবে। এক নজর ওকে দেখার জন্য কতই না দীর্ঘ প্রতীক্ষা।

আমি এগিয়ে গেলাম। সে আমাকে দেখে হাসলো। চশমা খুলে বলল, ‘আরে আপনি?’
“আপনি” সন্মোধনটা বেশ অবাক করলো। যদিও জানি এখন এই সন্মোধনটাই সাধারণ এবং পুরোপুরি মানানসই।
‘কি ব্যাপার কথা বলছেন না যে?’
অতীতেও রিমিকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা আমার ছিল না। আজো মনের অজান্তে সেই ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি হয়তো। বললাম, ‘দেশে ফিরলে কবে? তোমার হাজবেন্ডকে দিখছি না?’
রিমির হাসি হাসি মুখটা একটু মলিন হয়ে গেলো। ঠিক সেসময়ই চট করে আমার চোখ পড়লো তার চোখের ওপর। যে চোখের ভাষা মুখস্ত করতে করতে আমার নিশিদিন পার হতো সে চোখে কোন এক গহীন হতাশার ছায়া খেলা করছে কি?
কথা ঘুরিয়ে বললাম, ‘কি খাবে?’
‘আপনি কি খাবেন?’
‘আমাকে তুমি বললে ভালো হয়। অস্বস্থি লাগছে।’
‘ঠিক আছে বলবো? কি খাবে?’
‘আমি তেমন কিছু খাবো না। কফি খেতে পারি।’
আমি আর রিমি একটা ফাস্টফুডের দোকানে ঢুকে গেলাম। দোকানে কাস্টমার তেমন নেই। এ কারণে ওয়েটার এসে লম্বা সালাম ঠুকে দিল। এই সালামের অর্থ “বকশিস” কিন্তু দিতেই হবে।
আমি নিজের জন্য কফি আর রিমির জন্য বার্গার অর্ডার দিলাম। সে বলল, ‘আরে আরে করো কি? আমি ওসব খেতে পারি না।’
‘এসসময় তো খুবই পছন্দ করতে?’
‘একসময় তো অনেক কিছুই করতাম। এখন সবই অতীত।’
‘এত হতাশার কথা বলছো কেন?’
‘কেন তুমি বুঝি কোনো কিছুতেই হতাশ হও না?’
‘জীবনে আমি একটা সময় এত বেশি হতাশ হয়েছি যে এখন আর হতাশ হই না।’
‘তাই নাকি?’
রিমি কি বুঝে ‘তাই নাকি’ বলল, নাকি না বুঝে বলল ঠিক বুঝলাম না। অবশ্য বুঝেও না বোঝার ভান করা ওর স্বভাব। শেষ দিনের কথা চট করে মনে পড়ে যায়। যেদিন সে কতই না নিষ্ঠুর ভাবে বলেছিল- “দেখ আমি একজন ডাক্তার, আর আমার বাবা-মা চান ডাক্তার ছেলের সাথেই আমার বিয়ে হোক। এটা সব বাবা মা-ই চাইবে। তুমি স্বাভাবিক বিষয়টা মেনে নাও।”
সেদিন আমার হাত-পা কাঁপছিল। কোনোরকমে বলেছিলাম- “আমাদের এত দিনের ভালোবাসা?”
ওর উত্তরটা ছিল বাস্তববাদী- “দেখো সময়ের সাথে নিজেকে বদলাতে হয়। ভালোবাসা ইনজয় করার জিনিস, তবে জীবনে গেঁথে নেয়ার জিনিস না। দুজন প্রেম করেছি, ইনজয় করেছি। এখন বাস্তবতা মেনে নিতে হবে।”
আমি সে সময় রিমিকে এটা বোঝাতে পারিনি যে তুমি যা প্রেম ভেবে বসে আছো তা আমার জন্য ভালোবাসা।
আমি কফিতে চুমুক দিলাম। কেন জানি অতীতের বিষয়গুলো খুব ভাবাচ্ছে। যদিও এইসব বিষয় দ্রুত মাথা থেকে ঝেড়ে ফালা উচিত। কারণ সেই ষোল বছরের আগের গাধা প্রেমিক আমি নই। এখন আমি পুরোপুরি বিজনেসম্যান। এখন আর কাঁচা বয়সের প্রেমের মতো লস হিসেব করলে চলে না। এখন কেবলই লাভের ধান্ধায় ব্যস্ত থাকি।
কফির শেষ চুমুক দিতেই বললাম, ‘আমার উঠতে হবে। ছেলের স্কুল ছুটি হবে। ড্রাইভার ছুটিতে। নিজেকেই যেতে হবে।’
‘ঠিক আছে। ওঠা যাক।’
‘তুমি এখন থাকো কোথায়? জাস্ট জানার জন্য প্রশ্ন করলাম। ডোন্ড মাইন্ড।’
‘না, না, মাইন্ড করবো কেন? হলি চাইল্ডে জয়েন করেছি।’
‘জয়েন করেছি মানে? তুমি কি একেবারে দেশে ফিরে এসেছো?’
‘হুম।’
‘তোমার  হাজবেন্ডও কি এখন থেকে দেশেই থাকবে?’
‘না, ও দেশে ফিরবে না। সিডনীতে ও নতুন জীবন শুরু করেছে।’
‘ঠিক বুঝলাম না।’
‘আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।’
রিমি ব্যাগ গুছিয়ে তাড়াহুড়ো করে বের হয়ে গেলো।  আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওয়েটার বলল, ‘স্যার বিলটা।’
আমি বিল দিয়ে বের হলাম। গাড়ি ঘুরাতেই দেখি মোরে রিমি দাঁড়িয়ে। চোখে সানগ্লাস। একবার মনে হলো গাড়ি থাকিয়ে বলি, ‘কোথায় যাবে? চলো নামিয়ে দিচ্ছি।’
বলা হলো না। ও আমাকে রেখে অনেক আগেই জীবনের গাড়িতে ছুটেছিল। আমার দিকে ফিরেও তাকায়নি।

আমিও পিছনে ফিরে তাকাতে চাই না। তারপরও ব্যাক মিররে রিমির মুখটা দেখলাম। হঠাৎ মনে হলো ও নীরবে কাঁদছে। অযথাই বিশাল সানগ্লাস দিয়ে কান্নার রঙ ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে।

আহা জীবন!

লেখা : আহমেদ ফারুক
#হেডফোনের_প্যাঁচ
#বিষন্নবেলা
#I_am_back
#চেনা_দুঃখ_চেনা_সুখ_চেনা_চেনা_হাসিমুখ

Post a Comment

Previous Post Next Post