দেখতে দেখতে ঈদ এসে চলেও গেল। গত কয়েকদিন ধরে আমি ঈদ উপলক্ষে যে গল্পগুলি পাঠাচ্ছিলাম, আজকে তার শেষ পর্ব। আশা করি সবার ঈদ ভাল কেটেছে। গল্পটি যেহেতু রিপোস্ট অনেকেই আগে পড়েছেন, তবে যারা প্রথম বার পড়তে পারেনি তাদের জন্য আরেকবার গল্পটি পাঠালাম। ঈদ মোবারক।
রিপোস্ট
আমি রূপে তোমায় ভোলাবো না
বিভাগ: বড় গল্প
শাহাদুল চৌধুরী
(১)
ঈদের দিনে বৃষ্টি হওয়ার চাইতে খারাপ কিছু আর হতে পারে না। বৃষ্টির কারণে উৎসবের দিনটি সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তবুও আজকে হঠাৎ করে আসা এক পশলা বৃষ্টি মিতুকে একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচিয়ে দিল। ঈদের দিনে কেউ মেয়ে দেখতে চাইবে, এটা মিতুর কল্পনার বাইরে ছিল। বেশ কিছুদিন হয় তার বিয়ের কথা বার্তা আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর তাই হঠাৎ করে আসা এই সম্বন্ধ নিয়ে তার পরিবারে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সম্বন্ধে টি মিতুর একটুও পছন্দ হয়নি। ছেলে ইতালিতে থাকে। একটি জুতার কারখানায় শ্রমিকের কাজ করে। পড়ালেখা খুব একটা করেনি, বিএ ফেল করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিল বহুদিন হয়। মিতু লম্বা ছেলে খুব পছন্দ করে। ছেলেটি যখন পাশে এসে দাঁড়াল, মিতু লক্ষ্য করলো হিল পরা অবস্থায়ও ছেলেটি তার চাইতে লম্বায় ছোট।
(২)
মিতুর মনটাই খারাপ হয়ে গেল। মিতুর আসলে ভাগ্যটাই খারাপ। মিতুর বছর দুয়েক আগে একটা বেশ ভালো বিয়ের সম্বন্ধ এসেছিল। ছেলে বেশ শিক্ষিত ,ইঞ্জিনিয়ার। আমেরিকার নাগরিক। তবে পেশায় ব্যবসায়ী। সব ঠিকঠাক। পাত্রপক্ষ আসবে আংটি পরিয়ে দিতে, এমন সময় ছেলেটির একটি নতুন ব্যবসার সুযোগ আসে। সে নতুন ব্যবসায় সময় দেবার জন্য দেশে আসা স্থগিত করে। ব্যাপারটা সে তার মাকে জানায়,কিন্তু কোন এক বিচিত্র কারণে মহিলা ব্যাপারটি তাদের কে জানান না।তার পুরো পরিবার নিকট আত্মীয় স্বজনদের নিয়ে নির্ধারিত সন্ধ্যায় অপেক্ষা করতে থাকে ছেলেটির নিকটাত্মীয়দের আসবার। তাদের সেই সন্ধ্যায় আংটি পরিয়ে দিয়ে যাবার কথা ছিল। সে সন্ধ্যার পর থেকে একের পর এক দুর্ভাগ্য হানা দিতে থাকে মিতুর জীবনে। তারই ধারাবাহিকতায় আজকের এই অবস্থা। না হলে ঈদের দিন কেউ কখনো মেয়ে দেখাতে রাজি হয়? হোক ছেলে ঈদের পরপরই বিদেশে ফিরে যাবে। রাগে, দুঃখে ,কান্নায় মিতুর চোখ দিয়ে পানি বের হতে শুরু করল। পাত্রপক্ষ অবশ্য ব্যাপারটা ধরতে পারল না, তারা এটাকে বৃষ্টির পানি ভেবে ভুল করলো। যাবার সময় অবশ্য তারা বলল ফোনে জানাবে।মিতুকে এই পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে বহুবার যেতে হয়েছে। এর অর্থ সে এখন জানে। পাত্র পক্ষের মেয়ে পছন্দ হয়নি।
(৩)
ইংরেজীতে একটা কথা আছে,"Blessing in disguise." মিতুর কাছে ছেলে পক্ষের তাকে অপছন্দ করাটা বেশ খানিকটা স্বস্তি বয়ে নিয়ে আসলো। তার নিজেরও ছেলেটাকে একদম পছন্দ হয়নি। কিন্তু ভাইয়ের বাসায় আশ্রিতা একটি মেয়ে তার ভাই ভাবি কে বলতে পারে না, আমার ছেলে পছন্দ হয়নি, আমি আরো কিছুদিন অপেক্ষা করব। আমি যে সময়ের কথা বলছি তখনকার সমাজব্যবস্থা এ রকমই ছিল। নতুন সহস্রাব্দের তখন মাত্র শুরু হয়েছে। এখন হয়তো দিন বদলেছে। কিন্তু তখন মিতুর পক্ষে বলা সম্ভব ছিল না, জীবনের সবচাইতে বড় সিদ্ধান্ত নেবার জন্য তার আরেকটু সময় দরকার।
(৪)
ইংরেজিতে আরো একটা বেশ মজার কথা রয়েছে,"Fish that got away."এটা অবশ্য জেলেদের মাঝেই বেশি প্রচলিত। জেলেরা সারাদিন ধরে মাছ ধরে। তাদের খলুই ভরে যায় মাছে। কিন্তু যে মাছটি তারা খেলিয়ে নৌকায় তুলতে পারে না, দিনশেষে ঘরে ফেরার সময় সেই ছুটে যাওয়া মাছটার কথাই তাদের বেশি করে মনে পড়ে। আমাদের এই গল্পের নায়িকা মিতুও বছর দুয়েক আগে সেই প্রবাসী ছেলেটির সঙ্গে ভেঙ্গে যাওয়া বিয়ের কথাটা কিছুতেই ভুলতে পারে না। প্রথম দিকে বুকের ভেতর ছোট্ট একটা চড়ুই পাখির মতো কষ্টটা পুষতো।কবে যে সেই ছোট্ট চড়ুই পাখিটা একটি বাজ পাখিতে পরিণত হয়েছে তা সে জানতেই পারেনি। তার মনের একটি গোপন ইচ্ছা, ছেলেটি হঠাৎ করে একদিন দেশে ফিরে তার খোঁজ করবে। যদিও সে জানে বাস্তবে এটা হবার নয়। বাস্তব বড় কঠিন একটা জায়গা। সেখানে সিনেমার মতো কখনো কোনো ঘটনা ঘটে না।
(৫)
আমাদের ছোটবেলায় আমরা একটা কথা খুব বলতাম। দান দান তিন দান।গত ২ টা পরিচ্ছেদ শুরু করেছি দুটো ইংরেজি প্রবাদ দিয়ে। সুতরাং এই পরিচ্ছদেরও শুরু করব আরও একটি ইংরেজি প্রবাদ দিয়ে।"Truth is stranger than fiction sometimes!"মিতু জানতেই পারেনি গতকাল রাতে রাজিব দেশে ফিরেছে ঈদ করবার জন্য।তার মনেরও গোপন ইচ্ছা মিতুর সঙ্গে দেখা করে ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে ফেলার। এই মুহূর্তে ঈদের নামাজ পড়তে এসে সে ধানমন্ডি ঈদগাহের অর্ধ ভঙ্গ প্রাচীন ইটের পাঁচিলটার দিকে তাকিয়ে সেই কথাই ভাবছিল।নামাজের সময় আমাদের যাবতীয় জাগতিক চিন্তা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। আমরা যে বিন্দুটি তে সেজদা দেওয়ার সময় মাথা ছোঁয়াবো, আমাদেরকে ঠিক সেই বিন্দু টির দিকে তাকিয়ে থাকতে বলা হয়েছে। সেই বিন্দু থেকে যত দূরে আমাদের দৃষ্টি প্রসারিত হবে, আমাদের মনও নামাজ থেকে ঠিক ততটুকু দূরে সরে যাবে। কিন্তু এই মুহূর্তে ইমাম সাহেব নামাজ পড়াচ্ছিলেন না। তিনি অদ্ভুত সুন্দর কিছু কথা বলছিলেন মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে।সুতরাং এখন দৃষ্টি কিছুটা অন্য দিকে প্রসারিত করা যেতেই পারে। তাছাড়া দীর্ঘক্ষন মাটিতে পা মুড়ে বসে থাকার কারণে তার রক্ত চলাচলে কোনো একটা সমস্যা শুরু হয়েছে। মনটাকে ঘুমন্ত পা এর থেকেও ফেরানো দরকার। সে ঠিক করলো সে অতি দ্রুত মিতুর সঙ্গে যোগাযোগ করবে। তার যে খালা এই বিয়ের প্রস্তাব এনে ছিলেন তিনি জানিয়েছেন, মিতুর পরিবার কিছুতেই তার সাথে মিতুকে দেখা করতে দিবে না। কিন্তু তারা রাজিবকে চেনো না। সে চাইলে দু'রকম বরফ দিয়ে তৈরি ইগলুর ভিতরে বাস করে যে এস্কিমোরা, তাদের কাছে বরফ বেচে দিয়ে আসতে পারবে।তবে তাকে খুব শিগগিরই তার খালার সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
(৬)
যদিও রাজিব আসার পরপরই তার খালার সাথে দেখা করতে চেয়েছিল, কিন্তু সে যে দিন সত্যিই খালার বাসায় এসে পৌছালো ততোদিনে প্রায় সপ্তাহ খানেক পার হয়ে গেছে। কোথা দিয়ে যে একটি সপ্তাহ পার হয়ে গেল সে এক রহস্য। সারা দিন মেহমান আসছে তার সাথে দেখা করতে। সে নিজের জন্য কোন সময় বের করতে পারলো না।তার খালার বাসা টি পুরানা পল্টনে। সে যখন ঢাকা আসার সপ্তাহখানেক পরে তার খালার বাসায় গিয়ে পৌঁছল তখন পাশের বায়তুল মোকাররম মসজিদ থেকে সবে এশার আযান দিচ্ছে। হাউজ বিল্ডিং কর্পোরেশন এর হলুদ দপ্তরটির পাশ দিয়ে যে গলিটি ভেতরের দিকে গিয়েছে, এই ফ্ল্যাট বাড়িটার অবস্থান একেবারে তার শেষ মাথায়। সে যখন খালার বাসায় পৌঁছল তখন তিনি নামাজ পড়ছিলেন। সালাম ফিরিয়ে ইশারায় তাকে বসতে বললেন। নামাজ শেষে জায়নামাজ ভাজ করতে করতে অভিমানের সুরে বললেন,"এতদিনে খালার কথা মনে পড়ল?"
"প্রতিদিনই ভাবি আসবো, কিন্তু যখনই বেরোবো ভাবি ,তখনই কারো না কারো ফোন, বাসায় আসবে দেখা করতে। কি করে মানা করি বল?"
"আরেকটু আগে আসলে তোর মিতুর ছোট ভাইয়ের সাথে দেখা হতো। এসেছিল ঈদের দেখা করতে।আমার বউমার বড় ভাই আর ও একসাথে ঢাকা মেডিকেল থেকে পাশ করেছে। দুই বন্ধুতে খুবই ভাব। কিন্তু তোর উপর খুবই বিরক্ত।"
"বিরক্ত হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। তুমি বরংচ ওর বড় ভাইয়ের সাথে আমার কথা বলিয়ে দাও।"
"ঠিক আছে ,আমি ফোন লাগাই।"
"রায়হান বাবা, আমি তোমার লিলি খালা বলছি পুরানা পল্টন থেকে। ঈদে তো আসলেনা বাবা দেখা করতে।"
"জী ,খালাম্মা আসবো। আপনার শরীরটা ভালো?"
"এইতো আছি বাবা। রায়হান , তোমার রাজিব এর কথা মনে আছে না, আমার সেই ভাগনা, মিতুর সাথে যার বিয়ে কথা হয়েছিল?"
"জী মনে আছে।"
"ও কিন্তু দেশে এসেছে বাবা, ঈদ করতে। তোমার সাথে একটু কথা বলবে, এই নাও।"
"ভাই, আমি জানি আপনি আমার উপর খুব রেগে আছেন।তবে আপনি যদি ধৈর্য ধরে আমার কথা শুনেন ,তবে আমি আপনাকে বুঝিয়ে বলতে পারবে এর কারণ।"
(৭)
আমি যে আপনাদের বলেছিলাম রাজিব এস্কিমোদের কাছে বরফ বেচতে পারবে, আমি কিন্তু খুব একটা অত্যুক্তি করি নাই।যে ছেলের সাথে টেলিফোনে কথা বলতে চাচ্ছিল না রায়হান, তার সব কথা শুনে সে ছেলেটিকে ক্ষমা করে দিল। তার যে ব্যাপারটা সবচেয়ে ভালো লাগলো তা হল, ছেলেটি শাক দিয়ে মাছ ঢাকার কোন চেষ্টা করল না। প্রথম থেকেই স্বীকার করে নিল দোষটি তাদের। মানুষ যেহেতু অতীতে ফেরত যেতে পারে না, তাই এই ভুলটি শুধরাবার আর কোন উপায় নেই।তবে সে খুবই খুশি হবে, যদি সে মিতুর সঙ্গে একবার কথা বলতে পারে। তিনি ছেলের কাছে দিন দুই সময় চাইলেন, ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে দেখবার জন্য।আসলে তিনি তার মা এবং স্ত্রীর সাথে ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করতে চান।
(৮)
মিতুর সবচাইতে প্রিয় বান্ধবীর নাম শিরিন। ঘটনাক্রমে আজ তার বিয়ে হচ্ছে। মিতু গেছে সেই বিয়েতে। তাই তাদের খালি বাড়িতে কথা বলতে বেশ সুবিধা হল। ঠিক হলো, পরদিন দুপুরে মিতু যখন তার ভাবির রুমে আসবে শিরিনের বৌভাতে যাবার জন্য সাজা গুজা করতে, তখন তার ভাবি মিতুকে বাজিয়ে দেখবে। তারা জানতে চেয়ে ছিলেন মিতুর মনে কি আছে? যা জানতে পারলেন তা তাদের ভাবিয়ে তুললো। ছেলেটির কথা তুলতেই মিতু জানতে চাইলো সে দেশে ফিরেছে কিনা। তারপর তাঁর চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো। সে যে কান্না চাপার প্রচন্ড চেষ্টা করছে তা তার দিকে তাকিয়ে ভাবি বুঝতে পারলেন। তিনি মনে মনে বললেন, সর্বনাশ হয়ে গেছে। বিশেষ করে তিনি যখন জানতে পারলেন মেয়েটি এলিফ্যান্ট রোডে ছেলেটির দোকানের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়ায়,এই আশায় যদি হঠাৎ করে ছেলেটির সাথে তার দেখা হয়ে যায়। অথচ সে খুব ভালো করেই জানে ছেলেটি প্রবাসী, এ দেশে থাকে না। এটাকেই তো ইংরেজিতে বলে,"Hope against the hope," নাকি?
(৯)
মিতু শিরিণের বউভাতে চলে যাবার পরে পুরো পরিবার দ্বিতীয় দফায় বৈঠকে বসলো। ঠিক করা হল তাকে অন্ধকার থেকে আলোয় আনা হবে। তাকে সত্যি ঘটনা জানানো হবে। তারপর এটা মিতুর উপর ছেড়ে দেয়া হবে। আর তাই রাজিব যখন রায়হানকে দুইদিন পরে ফোন করলো, তখন আরও একটু সময় নেবার জন্য তিনি ছোট্ট একটি মিথ্যা বললেন। প্রয়োজনে এই ধরনের সাদা মিথ্যা আমরা কিন্তু প্রায়ই বলি। তিনি বললেন , মিতু বাসায় নেই। তার মেজ বোনের বাসায় বেড়াতে গেছে। মিতু যখন পুরো ব্যাপারটা জানলো, তখন সে সিদ্ধান্ত নিতে একটুও দ্বিধা করল না। ঠিক হল পরদিন সন্ধ্যায় তাদের বাসায় ছেলেটিকে ডাকা হবে।
(১০)
পরদিন সন্ধ্যায় রাজিব যখন তার খালার বাসায় আসলো খালাকে তুলতে, তার খালা খুবই বিরক্তি প্রকাশ করলেন।"তোকে কি আমি ফোন করে বলেছিলাম ওইদিনের লাল শার্ট টা পড়ে আসতে, তুই এই নীল শার্ট টা পড়লি কোন বুদ্ধিতে?তোকে যে লাল শার্টে খুব সুন্দর লাগে এটা কি তুই জানিস না।যার যেটা ভাল সে কিন্তু সবার আগে সেটা টের পায়। এই যে তুই আমার ঘন ডাল খুব পছন্দ করিস, কখনো দেখেছিস ,তুই আসবি আমি জানি ,আর আমি সেই ডালটা রান্না করি নাই?"
"খালা ,আমি জানি তুমি আমাকে লাল শার্ট পরতে বলেছ। কিন্তু কবিগুরু কি বলেছেন জানো? আমি রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব!"
" ছিঃ, মুরুব্বীর সামনে এইসব ভাব ভালোবাসার কথা বলতে তোর লজ্জা লাগে না?"
"খালা ,তোমাকে একটা কথা বলি।তুমি আমাকে মিতুর যে ছবিটা পাঠিয়েছিলে সেটা তোলা হয়েছে বেলি রোডের ফটোমেটিকে। গত দুই বছর ধরে ছবিটা আমি কতবার যে দেখেছি।আমি ঠিক করেছিলাম যদি মিতু আমার সাথে দেখা করতে রাজি না হয়, তবে ফটোমেটিক এ গিয়ে আমি একটা ছবি তুলব। যেই চেয়ারটায় মিতু বসেছিল ছবি তুলবার জন্যে, এক মুহূর্তের জন্য হলেও তো সেই চেয়ারটায় আমি বসতে পারবো? সেখানে আমি মিতুকে চাক্ষুষ দেখতে যাচ্ছি। আমার মাথা ঠিক নাই, আমাকে মাফ করে দাও।"
(১১)
রায়হান কে বুঝাতে রাজিবের সময় লেগেছিল বেশ অনেকক্ষণ। মিতুকে বোঝানোর কোন প্রয়োজন পড়লো না। ওর মনে যে ব্যাপারটা কাজ করেছে তা হল, ভুল আমরা সবাই করি।কিন্তু আমরা অধিকাংশ মানুষই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার একটা অপচেষ্টা চালাই।ছেলেটা দেশে ফিরে যদি অন্য কোন মেয়ে দেখতে যেত, তাহলে তাকে এত অপদস্ত হতে হতো না। সেখানে সে ফিরে এসেছে তার দরজায়। এটুকুই মিতুর জানার জন্য যথেষ্ট ছিল। আর তাই ছেলেটা যখন একগাদা কথা বলে চলছিল তার কিছুই ওর কানে গেল না। কথা শেষে রাজীব যখন বলল,"আমি জানি না আমি আপনার মত বদলাতে পারছি কিনা?আমার খুব ভালো লাগবে আপনি যদি বাকিটা জীবন আমার সাথে থাকেন, আমার পাশে থাকেন। আমি খুবই খাদ্য রসিক। আপনাদের ঘরে ঢুকেই প্রচন্ড ভালো খাওয়া-দাওয়ার গন্ধ পেলাম। তখন থেকেই পেটের মধ্যে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। সুতরাং আপনার উত্তর যদি না হয়, তবে অনুগ্রহ করে আমার খাওয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। আপনি যদি এখন না বলে দেন, তাহলে আমার মনে হয় না ওরা আমাকে খাওয়াবে। আর আপনি যদি আমার সাথে খেতে বসেন তাহলে বুঝবো আপনার উত্তর, হ্যাঁ। এই বিয়েতে আপনার মত আছে।"
(১২)
দিন সাতেক পরের আরেক সন্ধ্যা বেলা। সেগুনবাগিচার আল হাবিব কমিউনিটি সেন্টারে ওদের বিয়ে হচ্ছে। আপনাদের আগেই বলেছি রাজিব খুবই খাদ্য রসিক। সে ১২ বছর পর প্রথম কোন বিয়ের খাওয়া খাচ্ছে। এটা যে তার নিজের বিয়ে তা সে ভুলেই বসে আছে। পেট পুরে খেয়ে তখন তার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। তাকে যখন রুসমত এর জন্য তিন তলায় ডাকা হল,তখন সে একজন গর্ভবতী মেয়ের মতো হেলতে দুলতে ধীরে ধীরে তিনতলায় উঠে আসলো। তার পরনে তখন একটি অদ্ভুত ধরনের শেরওয়ানি। মিতু ভেবেছিল সে সাদা শেরওয়ানি পড়ে আসবে। কিন্তু রাজিবের শেরওয়ানির রং ছিল সোনালি। এটি একটি কাতান শাড়ি কেটে বানানো হয়েছে। বহু বছর আগে রাজিবের যে ছবিটি মিতু দেখেছিল, তাতে রাজীবকে রাজপুত্রের মত লাগছিল। কিন্তু মিতু আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলো, রাজীবকে সামনাসামনি দেখতে আরো সুন্দর দেখাচ্ছে। যেন সত্যিই একটি রাজার কুমার।ও যখন মঞ্চে উঠে মিতুর দিকে ভূবনমোহনী সেই হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল,"কেমন আছো মিতু ?"
মিতুর খুবই ইচ্ছা করলে বলে,"এই ,তুমি কি জানো তোমার হাসিটা কত সুন্দর?"
কিন্তু চারদিকে এত লোক। শেষ পর্যন্ত লজ্জায় মিতুর আর কিছুই বলা হয় না।

Post a Comment